হাতে লেগে থাকা বিয়ের মেহেদীর রং ও আংটি দেখে লাশ সনাক্ত করলেন বাবা

লাশে পোঁড়া গন্ধ। পুড়ে ছাঁই হয়ে গেছে সোনার শরীর। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রুপসদী দক্ষিণ পাড়ার বাবা রফিকুল ইসলাম পেশকার মেয়েকে ছোট থেকে আদর করে ডাকতেন সোনামনি বলে।

সেই নাম আজো রয়ে গেছে। আসল নাম আখি মনি হলেও সবাই ভালোবেসে ডাকতো সোনামনি। সেই সোনামনির লাশ যখন আজ সনাক্ত করা হয়, তখনও তার হাতে বিয়ের মেহেদীর রং লেগে ছিলো। পুড়েঁ যাওয়া শরীর চেনা যাচ্ছিলো না। শেষে বিয়ের মেহেদীর রং ও বিয়ের আংটি দেখে বাবা পেশকার মিয়া আজ বিশেষ বিমানে করে নেপাল যাবার পর লাশ সনাক্ত করেন।

জানা গেছে, পুড়েঁ যাওয়া মেয়ের শরীর দেখে বাবা ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারান। পরে নেপালের পুলিশ ও চিকিৎসকরা তাকে সেবা ও শান্তনা দেন।

উল্লেখ্য, নেপালে হানিমুন করতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রুপসদী গ্রামের রফিকুল ইসলাম পেশকার মিয়ার মেয়ে আঁখি মনি ও তার স্বামী আমেরিকা প্রবাসী মেহেদী হাসান বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে।

চলতি মার্চ মাসের ৩ তারিখে তাদের বিয়ে হয়েছিল। মেহেদীর বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার বাতাকান্দি গ্রামে। নবদম্পত্তি বিয়ের পর উঠেছিলো ঢাকার ধানমন্ডির একটি নতুন ফ্লাটে। আখিমনিদের বসতবাড়ি রুপসদীর দক্ষিণপাড়ার সরকার বাড়ি।

রামপুরায় বসবাসরত পেশকার মিয়ার পরিবারসূত্রে জানা গেছে,তাদের মেয়ে মেধাবী আখিমনি মাষ্টার্স পাশ করে পরিবারের সম্মতিতে গত ৩ মার্চ বেশ ধূমধাম করে বিয়ে হয়।মেয়ের ইচ্ছে অনুযায়ী হিমালয়কন্যার দেশ নেপালে যাওয়ার জন্য গত সপ্তাহে টিকিট বুকিং দেয়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিমানে। নেপাল সরকারের দেয়া মৃতদের তালিকার ৩৭ ও ৩৮ নং সিরিয়ালে রয়েছে এই হতভাগ্যদের নামের তালিকা।

গতকাল সকাল ১১টায় এয়ারপোর্টে পৌছে দিয়ে আসে পরিবারের সবাই। যাবার সময় কি এক অজানা আশংকায় আখিমনি বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। সেই অজানা আশংকাই সত্যি হলো। ২ টা বেজে ২০ মিনিটে তার নতুন বর মেহেদী হাসানসহ বিমানটি ক্রাশের স্থলেই আগুনে পুড়ে যায় বলে ধারনা করা হচ্ছে। লাশ এখনো নেপালের মর্গে আছে।

একটি সূত্রে জানা গেছে, আখিমনির বাবা এখন মেয়ের শোকে পাগল প্রায়। মা-র অবস্থাও একই। তারপরও মেয়ের টানে আজ সকাল নেপালের উদ্দেশ্যে দেশ ছেড়েছেন তিনি।

মৃত্যুর আগেও বাংলাদেশকে গর্বিত করে গেছেন পাইলট প্রিথুলা

নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার আগে ১০ নেপালি যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়ে নিজের জীবন দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বিমানটির বাংলাদেশী কো-পাইলট প্রিথুলা রশিদ। মৃত্যুর আগেও বাংলাদেশকে গর্বিত করে গেছেন এই বাঙালী কন্যা।

নেপাল ভিত্তিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও সামাজিক মাধ্যমে এই বীর নারীকে ‘ডটার অব বাংলাদেশ’ আখ্যা দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রিথুলা ছিলেন সোমবার বিধ্বস্ত হওয়া ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজের সহকারি পাইলট। পাইলট প্রিথুলা নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। শুধু তাই নয়, ইউএস বাংলার প্রথম নারী পাইলট ছিলেন তিনি।

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজটি গতকাল স্থানীয় সময় বেলা ২টা ২০ মিনিটে অবতরণের কথা ছিল। নামার আগেই এটি বিধ্বস্ত হয়ে বিমানবন্দরের পাশের একটি খেলার মাঠে পড়ে যায়। উড়োজাহাজটিতে চারজন ক্রু ও ৬৭ জন যাত্রী ছিলেন। এতে ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে বেঁচে আছেন ২১ জন।

সোমবার ঘটা এ দুর্ঘটনায় যাত্রী ছাড়াও বিমানটির কো-পাইলট প্রিথুলা রশিদ, ক্রু খাজা হোসেন ও ক্রু নাবিলা মারা যান। এর পর আজ সকালে মৃত্যুর কাছে হেরে গেছেন প্রধান পাইলট আবিদ সুলতান।

দুর্ঘটনা কবলিত বোমবার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ ৪০০ উড়োজাহাজটিতে ৩৭ জন পুরুষ ও ২৭ জন নারী ছাড়াও উড়োজাহাজটিতে ছিল শিশু। দুর্ঘটনায় নিজের কথা না ভেবে আগে সেই যাত্রীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন প্রিথুলা। দশ জন নেপালি যাত্রীকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদে সরিয়ে দিতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে করতেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় প্রিথুলার।

তবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রিথুলা রশিদের অন্যের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়নি। ওই দশ নেপালি যাত্রীর সবাই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে। তারা সবাই এখন বেঁচে আছে।

দুর্ঘটনার পর সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে ‘সিকিম ম্যাসেঞ্জার’ নামে একটি পেজে প্রিথুলার মহানুভবতার কথা তুলে ধরে বলা হয়, ‘আজ নেপালি নাগরিকদের বাঁচাতে গিয়ে বাংলাদেশি কন্যা তার নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। অন্যের জীবন বাঁচাতে গিয়ে কাঠমান্ডুতে আজ এই বাংলাদেশি তরুণী পাইলট মারা গেছেন।

তার নাম মিস প্রিথুলা রশিদ। তিনি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের (ফ্লাইট বিএস২১১) কো-পাইলট ছিলেন। যেটি আজ নেপালের কাঠামান্ডুতে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়েছে। যাই হোক, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ১০ নেপালি নাগরিককে রক্ষার চেষ্টা করে গেছেন। যাদের সবাই জীবিত আছেন।’

প্রিথুলার ফেসবুক পাতা থেকে জানা যায়, তিনি ২০১৬ সালের জুলাই মাস থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যুক্ত। নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার পর তিনি আরিরাং এভিয়েশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বিমান চালনার ওপর ডিগ্রি নেন। সুত্রঃ সময়ের কণ্ঠস্বর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *